Published Story
স্টেশনঘড়ি
1 chapterChapter 1

রাত ২টা ১৭ মিনিটে স্টেশনঘড়িটি থেমে ছিল। তবু প্ল্যাটফর্মের অন্ধকার প্রান্ত থেকে ট্রেনের চাকার শব্দ আসছিল—ধীরে, ভারী, যেন লোহার ওপর কেউ দাঁত ঘষছে। মেঘলা টর্চটি উঁচু করে ধরল। বৃষ্টির জল তার কোট বেয়ে গড়িয়ে পড়ছিল, আর হাতে ধরা পুরোনো চাবিটা কাঁপছিল অকারণে।
তুমি নিশ্চিত, চিঠিটা এখানেই লুকোনো ছিল?
চিঠি নয়। চিঠির শেষ লাইনটা। “যে ঘড়ি থেমে আছে, তার নিচে খুঁজো।”
আরিন প্ল্যাটফর্মের মাঝখানে দাঁড়ানো লোহার ঘড়িটির দিকে তাকাল। কাচ ভাঙা, কাঁটা ২টা ১৭ মিনিটে আটকে। ঘড়ির নিচে দেওয়ালে পুরোনো চুন খসে পড়ে কালচে ইট বেরিয়ে আছে। মেঘলা টর্চের আলো ফেলতেই ইটগুলোর ফাঁকে পাতলা লাল সুতো দেখা গেল।
লাল সুতো… ঠিক মায়ের ডায়েরির ছবিটার মতো।
তোমার মা কি এই স্টেশনে কখনও এসেছিলেন?
মেঘলা উত্তর দিল না। ডায়েরির শেষ পাতায় আঁকা সেই একই ঘড়ি, একই লাল সুতো, আর নিচে একটি নাম—“নির্মল”। নির্মল ছিল তার বাবার নাম। পনেরো বছর আগে যে মানুষটি নিখোঁজ হয়েছিল, পুলিশের নথিতে যার মৃত্যুর কোনও প্রমাণ নেই।
তিনি এখানে এসেছিলেন। ওই রাতেই নিখোঁজ হয়েছিলেন। কিন্তু ডায়েরিতে তারিখটা… আজকের। পনেরো বছর পরেও একই দিন।
আরিন লাল সুতোটি টেনে ধরতেই দেওয়ালের ভেতর থেকে ক্ষীণ ধাতব শব্দ হল। একটি ইট নিঃশব্দে সরে গেল। তার পেছনে ছোট্ট লোহার বাক্স। বাক্সের ওপর শুকিয়ে যাওয়া রক্তের দাগ, যেন কেউ আঙুল দিয়ে একটি অক্ষর লিখেছিল—“ম”।
বাক্সটা খুলবে না।
তাহলে এত দূর এসে কী করব? তোমার ভয় হচ্ছে?
ভয় নয়। হিসাব। যে মানুষ পনেরো বছর আগে বাক্সটা লুকিয়েছিল, সে জানত তুমি একদিন এটা খুঁজতে আসবে।

ঠিক তখনই স্টেশনের নিস্তব্ধতা ভেঙে গেল। দূরের সিগন্যাল বাতি একবার জ্বলে উঠল, তারপর নিভে গেল। রেললাইনের ওপর কুয়াশা সরিয়ে কালো একটি ছায়া এগিয়ে এল। ট্রেনের শব্দ এবার আর কল্পনা নয়—লাইন কাঁপছে।
এখানে তো আজ কোনও ট্রেন আসার কথা নেই।
কারণ এটা ট্রেন নয়।
লোহার শব্দ থেমে গেল। কুয়াশার ভেতর থেকে একটি পুরোনো লাল লণ্ঠন ভেসে উঠল—মানুষের হাত ছাড়া, বাতাসের বিপরীতে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে। বাক্সের ভেতর থেকে তখন টুং করে কিছু পড়ল। মেঘলা ঢাকনা খুলে ফেলেছে।
আরিন… এখানে একটা ছবি আছে।
ছবিটা আমাকে দাও।
মেঘলা ছবিটি উল্টে ধরল। সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে আছে তার বাবা, মা, আর একটি তৃতীয় মানুষ। লোকটির মুখ ছুরি দিয়ে কেটে ফেলা। কিন্তু তার হাতে ধরা লাল লণ্ঠনটি স্পষ্ট। ছবির পেছনে কাঁপা অক্ষরে লেখা—“মেঘলা জন্মানোর আগে থেকেই সে আমাদের দেখছে।”
তুমি এই ছবির লোকটাকে চেনো। তাই না?
আরিনের মুখের রং বদলে গেল। সে উত্তর দেওয়ার আগেই তার পকেটের ফোন বেজে উঠল। স্ক্রিনে কোনও নম্বর নেই—শুধু একটি শব্দ জ্বলছে: “মা”।
ফোনটা ধরো না।
ফোনের ওপাশ থেকে মেঘলার নিজের কণ্ঠ ভেসে এল—খুব কাছে, যেন ঠিক তার কানের ভেতর থেকে।
আরিন, তুমি ওকে বলোনি? তোমার মা-ই তো নির্মলকে মেরেছিল।